• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জামানত হারালেন তিন প্রার্থী নীলফামারীতে তিন দিনের ইজতেমা শুরু ভোটের দিনে লিফলেট বিতরণের দায়ে জামায়াত নেতার অর্থদন্ড নীলসাগর ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস: স্ট্রোকের ঝুঁকি, রিহ্যাবের সংকট ও পুনর্বাসনে সচেতনতার আহ্বান তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার হত্যা মামলায় মাগুরার সাবেক ওসি ও এসআই জেলহাজতে ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ৯ কর্মকর্তা প্রত্যাহার সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় জলঢাকা পৌরসভার সাবেক মেয়র গ্রেপ্তার রানীরবন্দরে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ব্যবসায়ী নিহত

পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে ভারত থেকে আমদানি

মধ্যপাড়াসিসি ডেস্ক: মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি থেকে পাথর উত্তোলন সাত মাস ধরে বন্ধ। এ সুযোগে ভারত থেকে পাথর আমদানির হিড়িক পড়েছে। পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন পাথর বোঝাই শত শত ভারতীয় ট্রাক ঢুকছে বাংলাদেশে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রেনেও। দর্শনা ও রহনপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসছে পাথরবাহী ট্রেন। একশ’ ইউনিটের বিশাল ট্রেন কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার টন পাথর নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে দেশীয় শিলা পাথর ব্যবহারের পথ রুদ্ধ করে রহস্যজনকভাবে দেশীয় পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে পার্শ্ববর্তী দেশের পাথর আমদানি করে ব্যবহার করা হচ্ছে মেগা প্রজেক্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কাজে। সুযোগ বুঝে আমদানিকৃত পাথরের মূল্য বাড়িয়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে দেশী-বিদেশী চক্র। পেট্রোবাংলার পরিচালনা পর্ষদের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার যোগসাজশে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি পাথর উত্তোলনে অনীহা ও অপারগতা প্রকাশ করার মাধ্যমে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে এখন ব্যবহার হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আমদানিকৃত পাথর। বিগত কয়েক যুগের তুলনায় রেলের অভাবনীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডে পাথর থেকে কংক্রিটের স্লিপার পর্যন্ত ভারত থেকে এনে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের বাংলাবান্ধা, সোনা মসজিদ, বুড়িমাড়ী হিলিসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে বিপুল পরিমাণ পাথর আমদানির কারণে পাথর জটের সৃষ্টি হয়েছে। আমদানিকৃত পাথর রাখার স্থান সংকুলান হচ্ছে না। অথচ এসব সেবা প্রকল্পে মধ্যপাড়া’র শিলা তথা পাথর ব্যবহার করা হলে দেশীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের পাশাপাশি কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় হতো। উল্লেখ্য, গত ২ মে কেবলমাত্র সোনা মসজিদ স্থল বন্দরে আমদানিকৃত ভারতীয় ৩-৪ ডাউন শিলা পাথরের মূল্য প্রতি সিএফটি বাংলাদেশী টাকায় ১শ’ থেকে ১১৮ টাকা করা হয়েছে। বন্দরের এক আমদানিকারকের মতে, দ্রুত মধ্যপাড়া’র পাথর উত্তোলন করার ব্যবস্থা নেয়া না হলে ভারতীয় পাথরের মূল্য আরো বেড়ে যাবে। খনি প্রকল্পের একটি দায়িত্বশীল সূত্র মতে, ছয় বছরের জন্য এক হাজার চার শত কোটি টাকার খনির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে (বিদেশী কনসালটেন্সী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়) খনি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত জিডিসি’র সিইও দোহা একজন পাথর ব্যবসায়ী। একজন পাথর ব্যবসায়ীকে দায়িত্ব দেয়া হয় খনি পরিচালনা তথা পাথর উত্তোলনের। জিডিসি ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি খনি পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে এবং গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ উৎপাদনে যায়। উৎপাদনের ছয় মাসের মধ্যে খনিতে তিন শিফটে কাজ করে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিন টন পাথর উত্তোলন করছিল। কিন্তু চুক্তি মোতাবেক দায়-দায়িত্ব সমূহ পরিচালনায় ঠিকাদারের অনীহা এবং অপারগতায় খনির ভূগর্ভে নতুন শিলা উৎপাদন স্টোপ উন্নয়ন সম্ভব না হওয়ায় শিলা উৎপাদন হার কমতে থাকে এবং গত ২৩/০৯/২০১৫ ইং হতে শিলা উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কেন এই দায়িত্বহীনতা। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেয়ে বের হয়ে আসে সুদূর প্রসারী চক্রান্তের তথ্য। কেননা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিকট ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বিশেষ করে রেলওয়ে, নদী শাসন এবং রাস্তার উন্নয়নে এই শিলা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মধ্যপাড়া খনি হতে শিলা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পাথর আমদানি ছাড়া কোন পথ থাকবে না। যা হবার তাই হয়েছে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পে পাথর উত্তোলন কমাতে কমাতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্ত সফল হয়। সুযোগ বুঝে ভারতীয় রপ্তানীকারকগণ লাগামহীনভাবে তাদের শিলার মূল্য বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। দফায় দফায় রফতানী মূল্য বৃদ্ধির কারণে বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা এবং সোনা মসজিদ বন্দর দিয়ে আমাদানিকারকগণ ভারতীয় ব্যবসায়ীদের এই অনৈতিক আচরণের প্রতিবাদে সকল প্রকার শিলা পাথর আমদানি কয়েক বার বন্ধ করে দেন। কিন্তু উপায় নেই পাথর ব্যবহারকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ব্যবসায়ীদের। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জিটিসি খনি পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই পেট্রোবাংলার পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি পরায়ণ কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে কাজ শুরু করে। সূত্রটির মতে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লক্ষ টন শিলা উৎপাদন করলেও তারা কোন নতুন স্টপ উন্নয়ন করে নাই। পূর্বের ঠিকাদার নামনাম যে ৫টি স্টপ উন্নয়ন করে ছিল মূলতঃ সেখান থেকেই উক্ত পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে জিটিসি ৬ বছর সময়ে ১২ স্টপ এবং ১ম ১৮ মাসে ৪টি স্টপ নির্মাণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২ বছরেও জিটিসি কোন পূর্ণাঙ্গ নতুন স্টপ নির্মাণ করতে পারেন নাই। শুধুমাত্র ২টি স্টপের আংশিক কাজ সম্পন্ন করেছে। লক্ষণীয় বিষয় যে, জিটিসি বরাবর অগ্রিমসহ মোট প্রায় ৩ শত কোটি প্রদান করা হলেও জিটিসি প্রায় ২ শত কোটি টাকার শিলা উত্তোলন করেছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায় পেট্রোবাংলা কোন স্বার্থে এবং কিভাবে চুক্তি মোতাবেক উন্নয়ন কাজ যথাযথ ভাবে না করলেও উন্নয়ন কাজ বাবদ জিটিসিকে অর্থ প্রদান করলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানায়, জিটিসি’র বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি’র প্রতিবাদ করায় কোম্পানীর পূর্বতন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আবুল বাশারকে অপসারণ করা হয়। এক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছেও চক্রান্তকারী চক্রটি ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছিল বলে সূত্রটি দাবী করেছে। যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে জিটিসি কর্তৃক ক্রয়কৃত মালামালের মূল্য বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি হওয়ায় জিটিসি’র দাখিলকৃত বিল অতিরিক্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। পরে জিটিসি’র সম্মতি সাপেক্ষে প্রায় ৪ কোটি টাকা খনি কর্তন করা হয়। শুধু তাই নয়, কঠিন শিলা খনি হতে উৎপাদিত একটি বিশেষ আকারের শিলার (৬০-৮০ মি:মি:) বিক্রয় মূল্য টনপ্রতি ০২ ডলার কমানোর অন্যায় আব্দার প্রত্যাখ্যান করেছিল সাবেক এমডি বাশার। সূত্রটির মতে, আবুল বাশারকে অপসারণের পর চক্রান্তকারী চক্রটি তাদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে উঠে। এক্ষেত্রে তারা খনি অভ্যন্তর ছাড়ায় বিদেশী চক্রের সাথে হাত মিলাতেও পিছপা হয় না। একপর্যায়ে শিলা উৎপাদন বন্ধের পাঁয়তারা করতে থাকে। অতঃপর ২৩/০৯/২০১৫ ইং হতে শিলা উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এর পর থেকেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি পেট্রোবাংলা ও খনি কর্তৃপক্ষকে বিভিন্নভাবে জিম্মি করে ফেলে। এদিকে খনি উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই জিটিসি খনি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে অভিযোগ করে যে, খনি কর্তৃপক্ষ সময়মত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না করায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে খনি কর্তৃপক্ষের সংগে আলোচনায় জানাযায়, জিটিসি’র চাহিদা মোতাবেক গত সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে মালামাল সমূহের বিপরীতে এলসি খোলা হলেও ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়ের (৬ মাস) মধ্যে মালামাল আমদানি করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু বেশ কিছু মালামালের এলসি’র মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ঠিকাদার এলসি’র মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ করেন। খনির অপারেশন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানাযায় ঠিকাদার পেট্রোবাংলা এবং খনি কর্তৃপক্ষের সহিত বিভিন্ন আলোচনায় রেজ বোরিং নামক যন্ত্র আনা সাপেক্ষে উন্নয়ন কাজ শুরু করা হবে মর্মে অঙ্গীকার করলেও উক্ত মালামাল আসার পরেও তারা খনির কাজ শুরু করার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করছে। উল্লেখ্য, জিটিসি কর্তৃক চুক্তি মোতাবেক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং অনীহার কারণে ইতিপূর্বে জিটিটিকে সতর্ক করে খনি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পত্র প্রদান করা হয়। দেশের মেগা প্রজেক্টে দেশীয় শিলা পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিলা উত্তোলন ত্বরান্বিত করার জন্য মন্ত্রী মহোদয় ১ শত কোটি টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন এবং সে মোতাবেক অধিকাংশ টাকা পেট্রো বাংলা খনির অনুকূলে ছাড় করে, অথচ এর পরেও খনির উৎপাদন করা যায় নি। উল্লেখ্য, জিটিসি চুক্তি মোতাবেক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং অনীহার কারণে ইতিপূর্বে জিটিসিকে সতর্ক করে খনি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পত্র প্রদান করা হয়। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ ও দাতা সংস্থা’র রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশের এবং দেশের মানুষের উন্নয়নে পদ্মা সেতুর মত ঐতিহাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন, সেই দেশে’র স্বার্থান্বেষী ঠিকাদার ও দুর্নীতি পরায়ণ কর্মকর্তা কিভাবে দেশীয় শিলা ব্যবহারের পথ রুদ্ধ করতে সাহস পায়। বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী বলেই দেশের বিবেকবান সমাজ মত প্রকাশ করেছে।

উৎসঃ   ইনকিলাব


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ